পুরাকালে বোধিসত্ত্ব হস্তীকুলে জন্মগ্রহণ করে আশি হাজার হাতির অধিপতি হয়েছিলেন। সে সময় এক লটুকিক পাখি হাতিদের বিচরণের স্থানে ডিম পেড়েছিল। সেই ডিম ফুটে একসময় ছানা বের হলো।
ছানাগুলোর তখনও পাখা গজায়নি, সেজন্য তারা উড়তে পারত না। এমন সময় বোধিসত্ত্ব দলবলসহ সেই পথে এসে উপস্থিত হলেন। তখন মা লটুকিক পাখি তার ছানাদের জীবন বাঁচাবার চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ল। সে ভাবল, হাতির পায়ের তলে পড়ে এই বুঝি তার ছানাদের প্রাণ যায়।
কাজেই সে তার ছানাদের প্রাণ বাঁচাবার জন্য হস্তীরূপী বোধিসত্ত্বের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে তার পাখা দুটি জোড় করে তার ছানাদের প্রাণরক্ষার জন্য বোধিসত্ত্বের কাছে মিনতি জানাল। বলল, হে হস্তীরাজ, আপনার বয়স ষাট বছর, আপনি যশস্বী, পর্বতের ওপরের সমতল ভূমিতে বিচরণ করেন। আমার দুটি পাখা জোড় করে আপনাকে বন্দনা করছি। আমার দুর্বল ছানাগুলোকে মারবেন না। বোধিসত্ত্ব বললেন, 'হে লটুকিক পাখির মা! তুমি ভয় পেও না। আমি তোমার ছানাদের রক্ষা করব' এই বলে তিনি ছানাগুলোকে পায়ের ফাঁকে আগলে রাখলেন। একে একে আশি হাজার হাতি চলে গেলে তিনি সরে দাঁড়ালেন। তারপর সেখান থেকে যাওয়ার সময় লটুকিক পাখির মাকে বললেন, আমাদের পিছনে একটি দলছাড়া হাতি আছে। সে একা। সে আমাদের কথা শোনে না, আমার আদেশও মানে না। কাজেই তুমি তার কাছে তোমার বাচ্চাদের বাঁচাবার জন্য প্রার্থনা করো। লটুকিক পাখি বোধিসত্ত্বকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় জানাল। তারপর সেই দলছুট হাতিটি এলো। মা লটুকিক পাখি দুটি পাখা জোড় করে তার বাচ্চাদের জীবন রক্ষা করার জন্য বিনীত প্রার্থনা জানাল। বলল, হে একাচারী অরণ্যবাসী, যশস্বী হস্তীরাজ, আপনার বয়স ষাট বছর, পর্বতের ওপরে সমতল ভূমিতে আপনি বিচরণ করেন। আমার দুটি পাখা জোড় করে আপনাকে বন্দনা জানাচ্ছি। আমার দুর্বল ছানাগুলোকে আপনি মারবেন না। তখন সেই একাচারী হাতি বলল, লটুকিক পাখি, আমি তোমার বাচ্চাগুলো পায়ে পিষে মারব। তুমি দুর্বল, তুমি আমার কী করতে পারবে? তোমার মতো শত শত লটুকিক পাখিকে আমার এই বাঁ পা দিয়ে শেষ করে দিতে পারি- এই বলে সে বাচ্চাগুলোকে পায়ে দলে পিষে চিৎকার করতে করতে চলে গেল।

বোধিসত্ত্বরূপী হস্তীরাজ লটুকিক ছানাদের রক্ষা করছে
মা লটুকিক গাছের শাখায় বসে বলল, হে হস্তীরাজ, তুমি আজ চিৎকার করতে করতে যাচ্ছ যাও। কয়দিন পরে আমি তোমার কী করতে পারি তা বুঝবে। শরীরের শক্তি থেকে জ্ঞানের বল যে শ্রেষ্ঠ তা তুমি জানো না। আমি তোমাকে উচিত শিক্ষা দেব।
তারপর লটুকিক পাখি এক কাকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করল। কাক তার বন্ধুত্বে খুশি হয়ে বলল, বন্ধু! আমি তোমার কী উপকার করতে পারি? লটুকিক পাখি বলল, বন্ধু! তোমার সরু ঠোঁট দিয়ে একদিন ঐ একাচারী হাতির চোখ তুলে নিতে পারবে? কাক লটুকিক পাখির দুঃখের কাহিনি শুনে বলল, আচ্ছা।
তারপর লটুকিক এক নীল মাছির সঙ্গে বন্ধুত্ব করল। নীল মাছিও কাকের মতো লটুকিক পাখির দুঃখের কথা শুনে খুব কষ্ট পেল। লটুকিক পাখি বলল, ভাই, কাক যখন হাতির চোখ তুলে নেবে, তুমি তখন সেখানে ডিম পাড়বে। এই আমার অনুরোধ। এতে নীল মাছি রাজি হলো। তারপর লটুকিক এক ব্যাঙের কাছে গেল। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করল। ব্যাঙও লটুকিক পাখির সব কথা শুনল। তখন লটুকিক বলল, ভাই ব্যাঙ! একাচারী হাতি চোখের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে পানি খাওয়ার জন্য এদিক সেদিক ছোটাছুটি করবে। তখন তুমি পাহাড়ের ওপর গিয়ে শব্দ করবে। হাতিটি তখন পাহাড়ে উঠবে। হাতিটি পাহাড়ে উঠলে তুমি নিচে নেমে শব্দ করবে। তখন হাতিটি পাহাড় থেকে নিচে নামতে চেষ্টা করবে। আর নিচে নামার সময় পা ফসকে গিরিখাতে পড়ে মরবে। এটুকু আমি তোমার কাছে চাই। ব্যাঙ তাতে রাজি হলো।
তারপর কাক হাতির চোখ দুটি তুলে নিল। নীল মাছি তাতে ডিম পাড়ল। হাতি চোখের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পানির খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করল। ব্যাঙ পাহাড়ের ওপর গিয়ে ডাকতে শুরু করল। অনেক কষ্টে হাতি পাহাড়ের ওপর উঠল। তখন ব্যাঙ পাহাড়ের নিচে খাড়া গিরিখাতে গিয়ে ডাকতে শুরু করল। হাতিও সেখানে ছুটল কিন্তু ওপর থেকে নিচে নামার সময় অন্ধ একাচারী হাতি গিরিখাতে পড়ে প্রাণ হারাল।
এভাবে লটুকিক পাখি বুদ্ধি দ্বারা বিশাল হাতিকে পরাজিত করে।
সেই একাচারী হাতি ছিল দেবদত্ত।
উপদেশ: দেহবলের চেয়ে জ্ঞানবল বড়।